Saturday, March 20, 2010

বাংলা একাডেমীতে সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলা!

অনেকদিন ধরিয়া বইমেলা শুরু হইয়াছে। যাইব যাইব করিয়া কিছুতেই সময় নির্ধারণ করিতে পারিলাম না আমি। হঠাৎ করিয়া আমাদের পার্শ্ববর্তী বাসায় বসবাসরত এক জোষ্ঠ্যভ্রাতা আমাকে মেলায় যাইবার জন্য তাগিদ দিতে লাগিলেন। অগত্যা তাহার এইরূপ অসামাজিক নম্র চরিত্রের কারণে মেলায় যাইবার উদ্যেগ গ্রহণ করিতে পারিলাম।
গতদিবস সাঁঝের পরমূহুর্তে এশার নামাজের পূর্বকালীন সময়ে আমি ছিলাম বাংলা একাডেমীর বইমেলার মূল প্রাঙ্গনে। তথায় আমি অন্যপ্রকাশ ও সময় প্রকাশনীসহ ব্লগারদের আড্ডার আশেপাশে ঘুরঘুর করিতেছিলাম। কিন্তু যে দু’চারজন ব্লগারদের দর্শন করিলাম,তাহাদের সামনে যাইবার নিমিত্তে আমি যারপর নাই চেষ্টা করিলাম তথাপি কিছুতেই তাহাদের সহিত কথা বলিবার জন্য মন সায় দিল না।
এর কারণ উল্লেখপূর্বক আমি আপনাদের মেলায় চামার এবং জুতার চামড়াযুক্ত কিছু লোকের সন্ত্রাসীসুলভ কর্মকান্ডের সুস্পষ্ট বিবরণ প্রদান করিব।
প্রথমত যে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করিয়া আমার মন খুশীতে ভরিয়া উঠিয়াছিল তাহা হইল অতীতের সমস্ত বইমেলা এবারের মেলার তুলনায় ছাই বৈকি!
কিন্তু মেলার মূল প্রবেশদ্বারে আসিয়া আমি চমকিয়া গেলাম। তথায় চারটি ছোট ছোট ফুলসম ছেলে-মেয়ে মনের আনন্দে খেলিতেছে। জীবন তাহাদের সবে টানিতেছে। পৃথিবীর বৈষ্ণতা তাহাদের বক্ষরেখায় ছায়াপাত করিতে পারে নাই।
খানিকবাদে যেইনা তাহারা মেলার ফটক দিয়া ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করিল,অমনি মেলার দাড়োয়ান সদৃশ ভলান্টিয়ার কর্মীরা তাহাদের ঘাড় পুচকে চন্ডালীর ন্যায় নিচু করিয়া সবেগে চটোপাঘাট করিল পিঠের মধ্যপ্রদেশে।
বাচ্চাগণ ব্যথায় একটুখানি শব্দ করিয়া পরক্ষণে দৌড়াইয়া ভলান্টিয়ার নামের জানোয়ার প্রজাতি হইতে নিজেদের আড়াল করিয়া লইল এবং মুক্তি পাইবার পরমানন্দে বিজয়ী সৈনিকের ন্যায় উল্লাসধ্বনি প্রকাশ করিল।
কেন ভলান্টিয়ার কর্মীদ্বয় বাচ্চাদিগকে প্রহার করিয়াছে শুনিয়া আপনারা হয়তো স্বাভাবিক ভাবিবেন,কিন্তু উহা আমার কাছে ছিল পুরোপুরি জন্তুসুলভ একপ্রকার আচরণের সামিল।
বাচ্চাগণের দোষ তেমন কিছুই নহে,তাহারা রাস্তা-ঘাটের সন্তান। ফাঁক পাইলে চুরি করে,নতুবা ভিক্ষা মাগি খাইতে চায়।
খানিকক্ষণ পরে কি করিয়া যেন বাচ্চাগণ মেলার ভিতরে প্রবেশ করিল। তারপর তাহারা ভিড়ের মাঝে মিশিয়া গেল। আমি তখন খুজিতেছিলাম আমার ব্লগ ডট কমের স্টল এবং ব্লগারদের আড্ডাখানা।
কিন্তু বারবার ঘুরিয়া ও লোকদিগকে জিজ্ঞ্যেস করিয়া যখন হাল ছাড়িয়া দিয়াছি,তখন দেখিলাম যুবতীদের ন্যায় বড় বড় চুল বাবরী করিয়া পিছনে গিট দিয়া জটাকারে রাখা এক যুবক, সঙ্গে যুবকদের ন্যায় ছোট ছোট চুল কিনারে সিথি করিয়া জিন্টসের প্যান্ট এবং টি শার্ট পরিহিত একাবিংশ বয়সের যুবতী।
তাহাদের দেখিয়া আমার মনে হইল সবে পাবনার হাসপাতাল হইতে ছাড়া পাইয়াছে,হয়তো বা কিঞ্চিত পথ্য খাওয়াইলে বুঝি সারিয়া যাইবে!
কিন্তু বড় চুলের সেই যুবক যখন তার যুবতী বান্ধবীকে ব্লগ বিষয়ে কি যেন বলিল,তখন আমি কান খারা করিয়া শুনিলাম আর ভাবিলাম,এরা নিশ্চয়ই বলিতে পারিবে ব্লগারদের আড্ডা কোথায় হয়।
তাই যথারিতি সেই কথা জিজ্ঞ্যেস করিলাম।
যুবকটি বলিল যে উহা রবীন্দ্র মঞ্চের পাশেই। কিন্তু কোথায় সে কথা স্পষ্ট করিয়া না বলিয়া সে আমাকে বলিল ওই হোথা রবীন্দ্র মঞ্চ। অনেকখানি রবীন্দ্রনাথের ফটিক চরিত্রের ন্যায়।
আমি আবার খুজিতে লাগিলাম সেই ব্লগারদের আড্ডাস্থল। পথিমধ্যে আমার দৃষ্টিতে অন্যপ্রকাশ-এর স্টল পড়িল।
সেথায় দেখিতে পাইলাম আমাদের ইমদাদুল হক মিলন সাহেব দুইপাশে দুইজন অতিবসুন্দরী রমণী সঙ্গে করিয়া চ্যানেল আই,এটিএন বাংলা,একুশে টেলিভিষণ ইত্যাদি বিভিন্ন চ্যানেলে তাহার গগণবিদারী আর্তনাদ দিতেছেন শিশুদের নিয়া তাঁহার ভালবাসার উপন্যাস সম্বন্ধে।
ঠিক ওই সময়ে আমি সেই চারজন বাচ্চাগণকে একই সাথে দেখিতে পাইলাম অন্যপ্রকাশের স্টলের সহিত দন্ডায়মান অবস্থায়। সেথায় তাহারা অভ্যাসজনিত সুর তুলিয়া ভিক্ষা মাগিতেছিল অন্যপ্রকাশের কাছে।
এ সময় অন্যপ্রকাশ হতে দুজন লোক ছুটিয়া আসিয়া তাহাদের একজনকে ধরিয়া ফেলিল এবং বয়স্ক চোরদের যেইরূপে মারে ঠিক সেইরূপে আঘাত করিল।
বাচ্চাটি ছিল একটি মেয়ে। আঘাত পাইয়া সে মাগো বলিয়া বসিয়া পড়িল। কিন্তু লোকদুজন সেই আর্তনাদকে পাত্তা দিল না। মেয়েটিকে পা দিয়া দাবড়াইয়া স্টলের সামনে হতে সরাইয়া দিতেছিল। নতুবা নাকি তাহাদের কাস্টমারদের অসুবিধা হইবে!
আমার প্রচন্ড আশ্চর্য লাগিল। একপাশে ইমদাদুল হক মিলন সাহেব শিশুদের ভালবাসার জন্য টিভি মিডিয়ায় গলা চালাচ্ছেন। আর তারই পাশে পথের শিশুরা মার খাইয়া রাস্তায় লুটোপুটি খাইতেছে।
এতো সত্যি কি সহজ কথা!
এদের কারণে শিশুরা বাড়িয়া উঠিতে উঠিতে হিংস্র পৃথিবীর গহ্বর ছাড়া চোখে অন্য কিছু দেখিতে পায় না। বড় হইয়া এরাই হয় হিরোঞ্চি কিংবা দেশের একজন মোস্ট ওয়ান্টেড কিলার। মেয়েগুলি হয়তো বা ঢাকার রাজপথের জাগ্রতরজনীর ভূমিকায় অভিনয় করিয়া পুরুষের মনোরঞ্জন নিবৃত করিতে সচেষ্ট হয়।
অথচ এই সমস্ত পথশিশুগুলি যদি সোনার চামচ মুখে লইয়া জন্মিত,তাহা হইলে হয়তো তারাই একদিন দেশের নেতা-নেত্রী,উকিল,ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হইত।
আমার মন হঠাৎ করিয়া ঝাড়া মারিয়া উঠিল। মনে হইল রাগের দমকে দমকে আমি বুঝি ফাটিয়া যাইব। সমগ্র পৃথিবীর আগ্নেয়গিরি আমার মগজের ভিতর একসাথে লাফাইয়া উঠিল। ইচ্ছা করিল তাহাদের সব কটাকে ধরিয়া আজিমপুর কবরখানায় পুতিয়া আসি।
তারপর মনে হইল,এহারা সমাজের কথিত সম্মানের লোক!
ইহাদের কিছু করিলে আইন সভা করিয়া,পাবলিক জনপ্রিয়তাকে পুজি করিয়া আমার বারটা বাজাইয়া দিবে স্বল্প সময়ের ভিতর। তাই আমার মন প্রচন্ড খারাপ হইয়া গেল।
খানিকবাদে ভারাক্রান্ত মানষিকতায় হাটিয়া রবীন্দ্র মঞ্চ খুজিয়া পাইলাম। তাহার পাশেই আমার ব্লগ ডট কম।
কি আশ্চর্য! সেই স্টলে ওই বড় বড় বাবরী চুলের যুবতী বেশের যুবকটি বসিয়া আছে। সেকি আমায় বলিতে পারিত না যে ভাই আমি আমারব্লগ ডট কমের একজন সম্মানিত কর্মী। তাহলেই তো আর আমাকে আধাঘন্টা কষ্ট করিয়া মেলার লেজে লেজে ঘুরিবার প্রয়োজন হইত না।
সকলেই কি আজকাল ব্যবসায় কেন্দ্রীক হইয়া গেল নাকি?
হয়তো বা। তাইতো এক বছর পর বাংলা একাডেমীতে যাইয়া দেখিতে পাইলাম সেথায় সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলার শুরু হইয়াছে সবে। এ হামলা চলবে প্রতি বছর,প্রতি ভাষার মাসে।


মোঃ আরাফাত হোসেন
মিরপুর-১,ঢাকা-১২১৬।
০১৬৭০১২৭৩২৮

No comments:

Post a Comment